Main Menu

রোস্তম আলী এবং আওয়ামী লীগের নিরব নিঃস্বার্থ সমর্থক

রোস্তম আলী লাকুরিয়া। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনয়িনের দিনারা গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় পুরান দিনারা হাটের একজন ছোট্ট চায়ের দোকানী। এটা তার পেশাগত পরিচয় হলেও আমাদের বিশাল বন্ধু সার্কেলের অতি আপনজন তিনি।
আমি ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী সময়টার কথা বলছি। ওই সময়টাতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসল। প্রায় ৯৬ ভাগ আওয়ামী লীগ নির্ভর আমাদের এলাকাতে তখন নেতারা ভয়ে দলের পরিচয় দেন না। আতঙ্কে ১৫ আগস্ট শোক দিবসের অনুষ্ঠানও করেন না। আজকের আমরা তখন কেউ কলেজে পড়ি, কারো কলেজ শেষের দিকে, কেউ স্কুল শেষ করেছে-এমন একটা বিশাল ব্যাচ দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন বঙ্গবন্ধু, তার কন্যা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কিছুই বুঝি না আমরা।
সন্ধ্যার পর ৫ থেকে ৭ জন বন্ধু এক জায়গায় হলেই জয়বাংলা/জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে মুখরিত করি এলাকা। হ্যামিলিয়নের বাঁশির মতো আমজনতায় আমাদের মিছিল বড় হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে অনেক দাপট দেখিয়েছেন- সেই নেতাদের দেখা পাই না। এগিয়ে এলেন ছোট্ট চায়ের দোকানী রোস্তম আলী লাকুরিয়া। আমাদের অনেকের রোস্তম কাকা।
মিছিলে স্লোগানে গলা ভাঙলে তিনি বিনা পয়সায় চা খাওয়াতেন আমাদের। ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের জন্য মাইক ভাড়া করে সেটি রাখার জায়গা পেতাম না। আমাদের পার্টি অফিস নেই, রাখবো কোথায়? ভরসা সেই রোস্তম কাকার দোকানটি।
বাজারে বিএনপির কয়েকজনের অপতৎপরতায় এক সময়রে সুবিধা নেওয়া আওয়ামী লীগের লোকজন মুখে কুলুপ এঁটে থাকতেন। তবে নির্ভয়ে এই রোস্তম কাকা আওয়ামী লীগের পক্ষে গলা চালাতেন নির্ভয়ে, অনেকটা একাই।
২০০১ সালের নির্বাচনের পরই আমরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মামলায় পড়লাম। এরপর আবারও মিথ্যা মামলার আসামি হলাম আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে। এখন কর্মজীবী হলেও তখন বেকার। মামলা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াই। বরাবরের মতো এই রোস্তম কাকা আশ্রয়ের ছাতা হলেন। আমাদের আত্মগোপনের জায়গায় তিনি গোপনে নিজের দোকানের কলা, রুটি, সিগারেট পৌঁছে দিতেন। না, কখনও টাকা নেন নি, টাকা চান নি। আমাদের গ্রেফতারে সাদা পোশাকে বা পোশাকে পুলিশ বাজারে আসলেই খবর পাঠাতেন পালাতে। তখন এতো মোবাইল ফোন ছিল না। নানা মারফতে তিনি খবর পাঠাতেন। আরো কতোভাবে বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যার আদর্শ বাস্তবায়নে তিনি নিরবে কাজ করে গেছেন।
সবচেয়ে বড় বিষয় আমাদের সব সময়ে সাহস দিয়ে রাখতেন। আমাদের গ্রুপের অনুপস্থিতিতে কেউ আমাদের বিরুদ্ধে কিছু বললে একাই প্রতিবাদ করতেন, ভয় পেতেন না।
বিএনপি-জামাত দুঃশাসনের অবসান হল। ততদিনে আমরা অনেকেই কর্মজীবী হয়ে গেলাম। বন্ধুদের কেউ বিদেশ চলে গেল। রয়ে গেল রোস্তম কাকার চায়ের দোকান। মাসিক ভাড়ায় চালানো দোকান। এরপরও কখনো এলাকায় গেলে তার দোকানে যাওয়া নিয়মিত ছিল। তার মনখোলা হাসি ক্লান্তি দূর করতো। চা খাওয়াতেন। টাকা দিতে চাইলে তার মুখ কালো হতো। শুধু বলতেন, ‌’ব্যাটা বড় হয়ে ফেরত দিস।’ তার চোখে সব সময়েই আমরা ছোট রয়ে গেছি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় দীর্ঘদিন। অনেক নতুন নেতার সৃষ্টি হল। রোস্তম কাকার চোখের সামনেই পুরান হাটে নতুন দোকান বরাদ্দ দেওয়া শুরু হল। আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপির লোকজন পেল বেশির ভাগ দোকান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ভাড়ায় চায়ের দোকান করে গেলেন। শেষ পর্যন্ত গত ২১ জানুয়ারী না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। পরে শুনেছি তার ইচ্ছে ছিল হাটে দোকানের একটা ভিটি তিনি বরাদ্দ পান। পার্টির দুর্নাম হবে সেই ভয়ে হয়তো মুখ খুলে বলেন নি। অভাবে থাকলেও তার মনটা ছিল বিশাল।
জীবনের শেষ সময়টা পর্যন্ত বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনার আদর্শ ধারণ করেছেন এই সাধারণ মানুষটি। নিরবে করে গেছেন অসাধারণ কাজ। আজীবন নিঃস্বার্থভাবে নৌকার সমর্থক হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি।
হয়তো সারাদেশের এই রুস্তম কাকাদের জন্যই আওয়ামী লীগ রক্ত বীজের সংগঠন হতে পেরেছে। হয়তো নিঃস্বার্থ এই সমর্থকদের কারণেই যুগ যুগ ধরে অত্যাচার, নিপীড়ন সহ্য করেও এগিয়ে যায় আওয়ামী লীগ। দুঃসময়ে নেতাদের দেখা না পাওয়া গেলেও সু-সময়ের অবহেলিত এই রুস্তম কাকারাই পার্টির র্দুদিনে পাশে থাকেন। মহান স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী প্রিয় সংগঠনকে টিকিয়ে রাখেন। তাদের নিরব আত্মত্যাগেই সুসময়ে নেতা হন অনেকে। পরে আর এই রোস্তম কাকাদের কথা মনে রাখেন না কেউ।

লেখক : -আতাউর রহমান, গণমাধ্যমকর্মী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা।